ব্রেকিংপ্রথম পাতা

২৩ লক্ষের ভবন, ১৫ লক্ষের যন্ত্রপাতি—উদ্বোধনের পরও চালু হলো না ফুলঝাড়ু প্রসেসিং কেন্দ্র

সরকারি অর্থ ব্যয়ের পর প্রকল্পের বাস্তব সুফল কোথায়, সেই জবাব এখন সংশ্লিষ্ট দপ্তরকেই দিতে হবে। লংতরাই ভ্যালি মহকুমার ছামনু ব্লক মোট ১৪টি এডিসি ভিলেজ নিয়ে গঠিত। এর মধ্যে অন্তত সাতটি ভিলেজে ব্যাপক পরিমাণে ফুলঝাড়ু উৎপাদিত হয়। রাজধর, মালিধর, গোবিন্দবাড়ি, ডেবাছড়া, উত্তর লংতরাই, পশ্চিম ছামনু ও মানিকপুর—এই ভিলেজগুলির বনাঞ্চল ফুলঝাড়ু উৎপাদনের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্র। স্থানীয়ভাবে প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী, এই এলাকায় বছরে প্রায় এক হাজার মেট্রিক টন ফুলঝাড়ু উৎপাদিত হয়

Pratibadi Kalam Newsroom4 মিনিট পড়া
২৩ লক্ষের ভবন, ১৫ লক্ষের যন্ত্রপাতি—উদ্বোধনের পরও চালু হলো না ফুলঝাড়ু প্রসেসিং কেন্দ্র

বনজ সম্পদকে ঘিরে স্বনির্ভরতার স্বপ্ন দেখানো হয়েছিল। ফুলঝাড়ু উৎপাদনকারী শ্রমিকদের উন্নত প্রশিক্ষণ দেওয়া, তাঁদের উৎপাদিত পণ্যের গুণগত মান বাড়ানো এবং বহিঃরাজ্যের বাজারে সরাসরি বিক্রির সুযোগ তৈরি করার প্রতিশ্রুতিও ছিল ত্রিপুরার ডাবল ইঞ্জিনের সরকারের। সেই লক্ষ্যেই প্রায় ২৩ লক্ষ টাকা ব্যয়ে নির্মাণ করা হয়েছিল ফুলঝাড়ু প্রসেসিং ও প্রশিক্ষণ কেন্দ্র।

কেনা হয়েছিল আরও প্রায় ১৫ লক্ষ টাকার যন্ত্রপাতি। কিন্তু উদ্বোধনের পর একদিনের জন্যও চালু হলো না সেই কেন্দ্র! আজ তার চারপাশে জঙ্গল, ভবনের দরজা-জানালা নষ্ট হচ্ছে, বৈদ্যুতিক পাখা চুরির অভিযোগ উঠছে। যে প্রকল্পের মাধ্যমে শ্রমিকদের আর্থিকভাবে স্বাবলম্বী করার কথা ছিল, সেটিই এখন সরকারি অবহেলার এক জ্বলন্ত উদাহরণ। ছামনু ব্লকের অধীন মকরছড়া এডিসি ভিলেজের বনকুমারীতে এই প্রসেসিং ইউনিটের বর্তমান অবস্থা নিয়ে স্থানীয় মানুষের মধ্যে ক্ষোভ বাড়ছে। প্রশ্ন উঠছে, লক্ষ লক্ষ টাকা খরচ করে একটি প্রকল্প নির্মাণের পর সেটি চালু রাখার ন্যূনতম ব্যবস্থাটুকুও কেন করা গেল না ? প্রকল্পের ভবন নির্মাণ হলো, যন্ত্রপাতি কেনা হলো, উদ্বোধনও হলো—কিন্তু উৎপাদন ও প্রশিক্ষণের কাজ শুরু হলো না কেন ?

সরকারি অর্থ ব্যয়ের পর প্রকল্পের বাস্তব সুফল কোথায়, সেই জবাব এখন সংশ্লিষ্ট দপ্তরকেই দিতে হবে। লংতরাই ভ্যালি মহকুমার ছামনু ব্লক মোট ১৪টি এডিসি ভিলেজ নিয়ে গঠিত। এর মধ্যে অন্তত সাতটি ভিলেজে ব্যাপক পরিমাণে ফুলঝাড়ু উৎপাদিত হয়। রাজধর, মালিধর, গোবিন্দবাড়ি, ডেবাছড়া, উত্তর লংতরাই, পশ্চিম ছামনু ও মানিকপুর—এই ভিলেজগুলির বনাঞ্চল ফুলঝাড়ু উৎপাদনের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্র। স্থানীয়ভাবে প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী, এই এলাকায় বছরে প্রায় এক হাজার মেট্রিক টন ফুলঝাড়ু উৎপাদিত হয়। সেপ্টেম্বর মাস থেকে ঝাড়ু গাছের বৃদ্ধি শুরু হয় এবং ফেব্রুয়ারি-মার্চ মাসে এলাকার উপজাতি শ্রমিকরা বন থেকে ফুলঝাড়ু সংগ্রহ করে বাজারে বিক্রি করেন। অর্থাৎ, এই অঞ্চলে শুধু একটি বনজ পণ্য উৎপাদিত হয় না, এর সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে বহু পরিবারের জীবিকা, গ্রামীণ অর্থনীতি এবং স্বনির্ভরতার সম্ভাবনা। অথচ সেই সম্ভাবনাকে কাজে লাগানোর বদলে সরকারি উদ্যোগের বাস্তব চিত্র যেন উল্টো পথে হাঁটছে।

২০২১-২২ অর্থবর্ষে ত্রিপুরা গ্রামীণ জীবিকা মিশনের উদ্যোগে বনকুমারীতে প্রায় ২৩ লক্ষ টাকা ব্যয়ে নির্মাণ করা হয় ফুলঝাড়ু প্রসেসিং ও প্রশিক্ষণ কেন্দ্র। উদ্দেশ্য ছিল, স্বসহায়ক দলের সদস্যদের প্রশিক্ষণ দিয়ে উন্নত মানের ফুলঝাড়ু তৈরি এবং বাজারজাত করার উপযোগী করে তোলা। পাশাপাশি প্রায় ১৫ লক্ষ টাকা ব্যয়ে কেনা হয়েছিল প্রয়োজনীয় যন্ত্রপাতি। কিন্তু এত বড় বিনিয়োগের পরও কেন্দ্রটি কার্যত অচল। এখানেই শেষ নয়, প্রকল্পটি চালু না হওয়ায় সরকারি অর্থের কার্যকারিতা নিয়েও প্রশ্ন উঠছে।

ভবন নির্মাণের পর রক্ষণাবেক্ষণের ব্যবস্থা কোথায় ছিল ? যন্ত্রপাতিগুলি বর্তমানে কোন অবস্থায় রয়েছে ? সেগুলি আদৌ ব্যবহারযোগ্য আছে কি না ? কেন্দ্রটি চালু করার জন্য কোনও প্রশিক্ষক, কর্মী কিংবা পরিচালন ব্যবস্থার পরিকল্পনা করা হয়েছিল কি ? উদ্বোধনের পর একদিনও কাজ না হলে প্রকল্পের অগ্রগতি বা ব্যর্থতা পর্যালোচনা করা হয়েছিল কি ? এসব প্রশ্নের উত্তর না পাওয়া পর্যন্ত এই প্রকল্পের দায় এড়ানোর সুযোগ নেই সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের। স্থানীয় বাসিন্দাদের অভিযোগ, বর্তমানে কেন্দ্রের চারপাশ জঙ্গলে ঢেকে যাচ্ছে।

ভবনের দরজা-জানালা নষ্ট হয়ে পড়ছে এবং বৈদ্যুতিক পাখা চুরি হয়ে গিয়েছে। এমনকি কেন্দ্রের জমিও বেদখল হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে বলে অভিযোগ। ঐ প্রকল্পের সম্পদ রক্ষায় প্রশাসনের নজরদারি কতটা ছিল, তা নিয়ে প্রশ্ন ওঠা স্বাভাবিক। সরকারি সম্পত্তি এভাবে অরক্ষিত অবস্থায় পড়ে থাকলে তার দায় কার ? সবচেয়ে বড় আঘাত পড়ছে বন থেকে ফুলঝাড়ু সংগ্রহকারী শ্রমিকদের উপর। অভিযোগ, স্থানীয় কিছু ব্যবসায়ী ও মধ্যস্বত্বভোগী তাঁদের কাছ থেকে কম দামে ফুলঝাড়ু কিনে নেন। অন্যদিকে, স্বসহায়ক দলগুলিও ফুলঝাড়ু সংগ্রহ করে বহিঃরাজ্যের কোম্পানির কাছে বিক্রি করে।

সেখানকার কোম্পানিগুলি তুলনামূলক কম দামে কাঁচামাল কিনে নিজেদের ব্যবস্থাপনায় তা প্রক্রিয়াকরণ করে উচ্চমূল্যে দেশের বিভিন্ন বাজারে বিক্রি করে। ফলে উৎপাদনের মূল পরিশ্রম যাঁদের, সেই বনজ শ্রমিকরা পণ্যের চূড়ান্ত বাজারমূল্যের ন্যায্য অংশ পাচ্ছেন কি না, তা নিয়ে গুরুতর প্রশ্ন রয়েছে। প্রসেসিং কেন্দ্রটি কার্যকর হলে এই পরিস্থিতিতে পরিবর্তনের সুযোগ তৈরি হতে পারত। স্থানীয় শ্রমিকদের উন্নত পদ্ধতিতে ফুলঝাড়ু তৈরি, বাছাই, মান নিয়ন্ত্রণ, প্যাকেজিং ও বাজারজাতকরণের প্রশিক্ষণ দেওয়া সম্ভব হতো। স্বসহায়ক দলগুলি কেবল কাঁচামাল বিক্রির মধ্যে সীমাবদ্ধ না থেকে মূল্য সংযোজিত পণ্য বাজারে পাঠানোর সুযোগ পেত।

এমনকি সংগঠিত বিপণন ব্যবস্থা গড়ে উঠলে বহিঃরাজ্যের ক্রেতাদের সঙ্গে সরাসরি যোগাযোগের পথও খুলতে পারত। তবে এসব সম্ভাবনা বাস্তবায়নের জন্য প্রশিক্ষণ, যন্ত্রপাতির ব্যবহার, বাজার সংযোগ এবং নিয়মিত পরিচালনার ব্যবস্থা অপরিহার্য। এখন দাবি উঠছে, কেন্দ্রটি কেন চালু করা যায়নি, তার কারণ প্রকাশ করতে হবে।

প্রায় ১৫ লক্ষ টাকার যন্ত্রপাতির বর্তমান অবস্থার হিসাব দিতে হবে। প্রকল্পের জমি, ভবন ও অন্যান্য সম্পত্তি সুরক্ষিত করার পাশাপাশি দ্রুত কেন্দ্রটি চালুর জন্য নির্দিষ্ট সময়সীমা ঘোষণা করতে হবে। একই সঙ্গে শ্রমিকদের ন্যায্য দাম নিশ্চিত করতে বাজার সংযোগ ও স্বসহায়ক দলগুলির কার্যকর ভূমিকা বাড়ানোর পরিকল্পনাও সামনে আনতে হবে। এখন প্রশ্ন একটাই—স্বনির্ভরতার নামে ৩৮ লক্ষ টাকারও বেশি সরকারি বিনিয়োগ যদি উদ্বোধনের পর তালাবন্দি হয়ে থাকে, তবে সেই প্রকল্পের সাফল্যের হিসাব দেবে কে ?

বনকুমারীর ফুলঝাড়ু শ্রমিকরা কি শুধু কাঁচামাল সংগ্রহ করে কম দামে বিক্রি করার জন্যই থেকে যাবেন, আর লাভের বড় অংশ চলে যাবে অন্যের হাতে ? জঙ্গল পরিষ্কার করে শ্রমিকদের হাতে কাজ তুলে দেওয়ার কথা ছিল যে কেন্দ্রের, সেটিই আজ জঙ্গলে হারিয়ে যাচ্ছে। সরকারি প্রকল্পের ফলক আর উদ্বোধনী অনুষ্ঠান দিয়ে উন্নয়ন হয় না—উন্নয়ন প্রমাণ করতে হয় মানুষের আয়, কর্মসংস্থান এবং প্রকল্পের বাস্তব ব্যবহারে। ফুলঝাড়ু প্রসেসিং কেন্দ্রের তালা খুলবে কবে, যন্ত্রপাতি কাজে লাগবে কবে, আর শ্রমিকরা তাঁদের পরিশ্রমের ন্যায্য মূল্য পাবেন কবে—এই প্রশ্নের জবাব আর এড়িয়ে যাওয়ার সুযোগ নেই ডাবল ইঞ্জিনের সরকারের কাছে।