ব্রেকিংসম্পাদকীয়

উৎসবের মুখে ফের বানিজ্যিক সিলিন্ডারের গ্যাসের মূল্যবৃদ্ধি

উৎসবের মরশুমে সাধারণ মানুষের মুখে যখন সরকারের হাসি ফোটানোর কথা, তখন এর পুরোপুরি উল্টো পথে নতুন করে খরচের বোঝা চাপলো ব্যবসায়ী ও ভোক্তাদের কাঁধে। ১ নভেম্বর থেকে ১৯ কেজির বাণিজ্যিক LPG সিলিন্ডারের দাম আরও ১০ টাকা বৃদ্ধি পেয়েছে।

Pratibadi Kalam Newsroom3 মিনিট পড়া
উৎসবের মুখে ফের বানিজ্যিক সিলিন্ডারের গ্যাসের মূল্যবৃদ্ধি

আগরতলা:: উৎসবের মরশুমে সাধারণ মানুষের মুখে যখন সরকারের হাসি ফোটানোর কথা, তখন এর পুরোপুরি উল্টো পথে নতুন করে খরচের বোঝা চাপলো ব্যবসায়ী ও ভোক্তাদের কাঁধে। ১ নভেম্বর থেকে ১৯ কেজির বাণিজ্যিক LPG সিলিন্ডারের দাম আরও ১০ টাকা বৃদ্ধি পেয়েছে।

নতুন সংশোধনে দিল্লিতে একটি বাণিজ্যিক সিলিন্ডারের দাম দাঁড়িয়েছে ২,৮২০ টাকা। আপাতদৃষ্টিতে ১০ টাকার এই বৃদ্ধি খুব বড় অঙ্ক বলে মনে না হলেও, এর পিছনে রয়েছে ধারাবাহিক মূল্যবৃদ্ধির চাপ এবং তার বহুমুখী প্রভাব। সেপ্টেম্বর মাসে ৯.৫০ টাকা, অক্টোবর মাসে ৬২.৫০ টাকা এবং নভেম্বর মাসে আরও ১০ টাকা—পরপর তিন মাসের এই বৃদ্ধিতে বাণিজ্যিক রান্নার গ্যাসের খরচ বাড়ছে। ফলে প্রশ্ন উঠছে, আন্তর্জাতিক বাজারের অস্থিরতার অজুহাতে সাধারণ মানুষের দৈনন্দিন জীবনযাত্রার ব্যয়ের চাপ বাড়তে থাকলে তার দায়বদ্ধতা নেবে কে ? কেন্দ্রীয় সরকারের কাছে সবচেয়ে বড় প্রশ্ন এখানেই। বাণিজ্যিক LPG-র দাম রাষ্ট্রায়ত্ত তেল বিপণন সংস্থাগুলি আন্তর্জাতিক বাজারের মূল্য এবং ডলারের বিপরীতে টাকার বিনিময়মূল্যের ভিত্তিতে সংশোধন করে।

কেন্দ্রের বক্তব্য হতে পারে, আন্তর্জাতিক জ্বালানি বাজারের ওঠানামার সঙ্গে এই মূল্যবৃদ্ধি সম্পর্কিত। কিন্তু সেই যুক্তি দেখিয়ে সরকারের জনস্বার্থমূলক দায়িত্ব এড়িয়ে যাওয়ার সুযোগ কতটা ? আন্তর্জাতিক বাজারের প্রভাব থাকলেও দেশের ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী, হোটেল মালিক, রেস্তোরাঁ পরিচালনাকারী এবং সাধারণ ক্রেতার উপর তার অভিঘাত কীভাবে কমানো হবে, সেই প্রশ্নের উত্তরও সরকারের নীতিগত দায়িত্বের মধ্যেই পড়ে। শুধু বাজারের যুক্তি তুলে ধরলেই নাগরিকদের আর্থিক দুর্ভোগের অবসান হবে না। সবচেয়ে বড় ধাক্কা আসতে পারে ছোট হোটেল, রেস্তোরাঁ, ধাবা, খাবারের দোকান, মিষ্টির দোকান এবং রাস্তার ধারের চায়ের স্টলগুলিতে। এই ব্যবসাগুলির একটি বড় অংশ রান্নার জন্য বাণিজ্যিক LPG-র উপর নির্ভরশীল। প্রতিদিন একাধিক সিলিন্ডার ব্যবহার করা প্রতিষ্ঠানগুলির ক্ষেত্রে সামান্য মূল্যবৃদ্ধিও মাসের শেষে অতিরিক্ত ব্যয়ের কারণ হয়ে দাঁড়ায়। বিশেষ করে যেসব ছোট ব্যবসার লাভের পরিমাণ এমনিতেই সীমিত, তাদের কাছে প্রতিটি অতিরিক্ত খরচ গুরুত্বপূর্ণ। কাঁচামালের দাম, দোকানভাড়া, কর্মচারীদের মজুরি এবং বিদ্যুতের বিল মেটানোর পর গ্যাসের খরচ বাড়লে লাভের অঙ্ক আরও সংকুচিত হতে পারে। এর পরবর্তী আঘাত পৌঁছতে পারে সাধারণ ক্রেতার রান্নাঘরে।

হোটেল বা রেস্তোরাঁর মালিক যদি উৎপাদন খরচ সামলাতে খাবারের দাম বাড়ানোর সিদ্ধান্ত নেন, তাহলে তার প্রভাব পড়বে গ্রাহকের পকেটে। সকালের জলখাবার, দুপুরের খাবার, সন্ধ্যার চা-নাশতা কিংবা বাইরে খেতে যাওয়ার খরচ—সব ক্ষেত্রেই দাম বাড়ানোর প্রবণতা তৈরি হতে পারে। যদিও প্রতিটি ব্যবসায়ী দাম বাড়াবেন, এমন নিশ্চয়তা নেই, তবুও বাড়তি উৎপাদন খরচ সামলানোর চাপ যে তৈরি হবে, তা অস্বীকার করা যায় না। ফলে সরাসরি বাণিজ্যিক সিলিন্ডার ব্যবহার না করলেও সাধারণ মানুষ পরোক্ষভাবে এই মূল্যবৃদ্ধির বোঝা বহন করতে পারেন। ত্রিপুরার মতো রাজ্যেও বিষয়টি যথেষ্ট গুরুত্বপূর্ণ। আগরতলা-সহ বিভিন্ন শহর ও মহকুমার ছোট খাবারের দোকান, হোটেল, রেস্তোরাঁ এবং ক্যাটারিং ব্যবসা স্থানীয় মানুষের দৈনন্দিন চাহিদার সঙ্গে যুক্ত। বাণিজ্যিক গ্যাসের খরচ বাড়লে ব্যবসায়ীদের সামনে দুটি পথ থাকে—নিজেদের লাভ কমিয়ে পরিস্থিতি সামলানো, অথবা খাবারের মূল্য বাড়িয়ে অতিরিক্ত ব্যয় ক্রেতার উপর চাপিয়ে দেওয়া।

দুই ক্ষেত্রেই সমস্যা। প্রথম ক্ষেত্রে ক্ষুদ্র ব্যবসার আর্থিক স্থায়িত্ব দুর্বল হয়, দ্বিতীয় ক্ষেত্রে সাধারণ মানুষের দৈনন্দিন খরচ বাড়ে। স্থানীয় বাজারে প্রতিযোগিতার কারণে সবাই সমানভাবে দাম বাড়াতেও পারেন না। ফলে ছোট ব্যবসায়ীদের উপর চাপ আরও বাড়তে পারে। উল্লেখ্য এর আগেও চলতি বছরের সেপ্টেম্বর, অক্টোবর ও নভেম্বর মাসে বানিজ্যক গ্যাস সেলেন্ডারের দাম বেড়েছে। এখন সরকারের কাছে সরাসরি কয়েকটি প্রশ্নের উত্তর প্রয়োজন। আন্তর্জাতিক বাজারে দাম বাড়লে তার প্রভাব কি সবসময় একইভাবে দেশের ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীদের উপর পড়বে ? মূল্যবৃদ্ধির অভিঘাত কমাতে কোনও কার্যকর নীতিগত সহায়তা দেওয়া হবেনা কেন ? সবশেষে প্রশ্ন একটাই—জ্বালানি বাজারের প্রতিটি ওঠানামার অভিঘাত যদি শেষ পর্যন্ত সাধারণ ক্রেতা ও ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীর ঘাড়েই এসে পড়ে, তাহলে তাঁদের আর্থিক সুরক্ষার দায়িত্ব নেবে কে ? কেন্দ্রীয় সরকার আন্তর্জাতিক বাজারের দোহাই দিতে পারে, কিন্তু দেশের বাজারে মূল্যবৃদ্ধির প্রভাব সামলানোর দায়িত্ব থেকে সরে দাঁড়াতে পারে না।

১০ টাকা বৃদ্ধি হয়তো একটি সিলিন্ডারের হিসাবে সামান্য, কিন্তু ধারাবাহিক মূল্যবৃদ্ধির পরিবেশে এই সামান্য অঙ্কই হাজার হাজার ক্ষুদ্র ব্যবসার হিসাব ওলটপালট করে দিতে পারে। সরকারের কাছে এখন আর শুধু মূল্যবৃদ্ধির ব্যাখ্যা নয়, প্রয়োজন সাধারণ মানুষের পকেট বাঁচানোর কার্যকর রূপরেখা। কারণ রান্নার গ্যাসের দাম বাড়লে শুধু সিলিন্ডার নয়, বাড়ে খাবারের খরচ, বাড়ে সংসারের হিসাবের চাপ। আন্তর্জাতিক বাজারের আগুনে দেশের সাধারণ মানুষের পকেট আর কতদিন পুড়বে—এই প্রশ্নের জবাব কেন্দ্রীয় সরকারকেই দিতে হবে।